parallax background

সুনামগঞ্জ এর একটি ভিন্ন ধরণের স্কুল

June 23, 2017
An unlikely school in Sunamganj
June 22, 2017

হাওরের বুকে আরেকটি দিনের শুরু। গত কয়দিন ধরে চলা বৃষ্টি আজ যেন আরও জোরে নামছে।

হঠাৎ তাকালে চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ লাগে। এখানে যতদূর চোখ যায়, চোখে পড়ে আরও অনেক বৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষায় থাকা ধূসর, কালো মেঘ। বৃষ্টির মৃদু ছন্দময় ধ্বনি শোনা যায়। আকস্মিক বন্যায় সর্বস্ব হারানো অনেক পরিবার, বিশেষ করে কৃষক পরিবারগুলো যারা হারিয়েছে সমস্ত ফসল- তাদের বেশির ভাগই কাজের সন্ধানে শহরের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এই এলাকায় বহু কৃষক এবং জেলের বসবাস, কিন্তু চাষ করবার মত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বন্যায় ভেসে গেছে ফসল ও মাছ, অবলম্বন বলতে তাদের আর কিছুই নেই।

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে একটি অন্যরকম আওয়াজ। ছই লাগানো একটি মোটর চালিত নৌকা বিকট আওয়াজ তুলে ভেসে আসে পাড়ের দিকে। এই মলিন, বিষন্ন পরিবেশের সাথে দৃশ্যটি কেমন যেন বেমানান লাগে। কারণ, চারপাশের সব বিষন্নতা ছাপিয়ে একদল উচ্ছল, প্রাণবন্ত কিশোর-কিশোরী, সেই নৌকায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের পরণে সাদা এবং সবুজ রং-য়ের ইউনিফরম, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ।

নৌকায় থাকা ২০জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন হলো পাপিয়া যে রোজ এই নৌকায় চড়ে স্কুলে যায়, আবার স্কুলে শেষে নৌকা করে বাড়ি ফেরে। ছইয়ের ভেতর থেকে অন্য মেয়েদের সাথে সে বেরিয়ে আসে এবং জানায় ছেলেগুলো নৌকায় আজ অন্যদিনের থেকে বেশি হই-হুল্লোড় করছে!

“আপনারা এমন একটা সময় আইলেন যখন চারদিকে শুধু পানি আর পানি, জানেন অন্যসময় আমাদের গ্রামটা এত্ত সুন্দর! চারপাশে পানির বদলে থাকে ঝকঝকে সবুজ। তাও কি আর করা, এখনও ঘুইরা দেখতে পারেন, ভালোই লাগবো।“

৭ম শ্রেণীর ছাত্রী পাপিয়া তার বাসা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করে। তার বাসা থেকে স্কুলে হেঁটে যেতে প্রায় ১ ঘন্টা সময় লাগে।

“আমার নৌকায় চড়ে স্কুলে যাইতে বেশি ভালো লাগে। বন্ধুরা সবাই একসাথে যাই, ভালো একটা সময় কাটে”- সে বলে।

পাপিয়ার স্কুলটি একটি বড় এক তালা ভবন, যার সামনে আছে বিশাল এক মাঠ। ব্র্যাকের বিস্তৃত শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসাবে পরিচালিত এই স্কুলটিতে যথাযোগ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্ন নেয়া হয় এবং শিক্ষকদেরও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। হাওর এলাকা জুড়ে সব থমকে গেলেও এখানে থেমে নেই কিছুই। দূর্যোগ অবস্থার মধ্যেও এখানে সব কিছুই যেন আগের মত স্বাভাবিক, রঙ্গিন ও কর্মমূখর। স্কুলভবনের টিনের ছাদের একটি অংশ ঝড়ে উড়ে গেলেও বিকল্প ব্যবস্থায় চলছে ক্লাস, পড়াশোনা।

তবে সবাই যে স্কুলে যেতে পারছে, ব্যাপারটা এমন নয়। বন্যার পর পাপিয়ার স্কুল এবং আশেপাশের এলাকার অন্যান্য স্কুলেও উপস্থিতির সংখ্যা খুবই নগন্য। পাপিয়ার অনেক বন্ধুও নিজ পরিবারের সাথে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছে এবং তারা কবে ফিরবে তার কোন সঠিক ধারণাও তার কাছে নেই। তার পরিবারকে গ্রাম ত্যাগ করতে না হওয়ায় সে কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। ভাগ্যক্রমে, তাদের অল্প যেটুকু জমি আছে সেখানে বন্যা ফসলের খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনি।

পাপিয়া অধীর আগ্রহে ঈদের ছুটির জন্য অপেক্ষা করছে, যদিও সে জানে এবারের ঈদটা অন্যান্যবারের মত আনন্দমুখর হবে না। অন্যসময় সাধারণত সে আশেপাশের গ্রামে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যায়, কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে এবার সকলেই বন্যার পর কাজের সন্ধানে ঢাকায় চলে গেছে। “পানি কবে কমবে আমরা কইতে পারি না; অনেকেই বলতেছে আগামী বছর পানি থাকতে পারে।“

পাপিয়া আরও বলে, “আমার অনেক বন্ধু চলে গেলেও আমি এখানে আছি। আমার স্কুলে যাইতে খুব ভালো লাগে। গতমাসেই ক্লাসে একটা পরীক্ষায় আমি অংকে ১০০তে ৮০ পাইছি। আম্মু কত খুশি হইছিল!”

হাওর এলাকায় সময় থমকে গেলেও স্কুলগুলো যেন বন্ধ না হয়ে যায় আমরা সেটাই নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। আমরা তহবিল যোগাড় করার চেষ্টা করছি যেন এই এলাকায় স্কুলগুলো পুরোদমে চলতে থাকে এবং আমাদের নৌকাগুলো রোজ ৩০০০ স্কুলশিক্ষার্থী আনা নেওয়া করতে পারে। আপনাদের খুব সামান্য আর্থিক সহায়তা পারে পাপিয়াদের জীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে, এই মুহূর্তে যা তাদের বড্ড প্রয়োজন।